সুন্দরবনের ইকো রিসোর্ট গুলো কিভাবে বদলে দিয়েছে বনজসম্পদ উজাড় করা মানুষদের জীবন ও জীবিকা ?
খুলনার দাকোপ উপজেলার ঢাংমারী এখন আর শুধু সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার নয়; এটি হয়ে উঠেছে স্থানীয় মানুষের জীবন বদলের এক অনন্য উদাহরণ। কয়েক বছর আগেও এখানকার বহু মানুষ জীবিকার জন্য নির্ভর করতেন সুন্দরবনের ওপর। কেউ মাছ ধরতেন, কেউ কাঠ সংগ্রহ করতেন, আবার কেউ বনজ সম্পদ আহরণ করতেন। কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে।
ঢাংমারী খালের পাড়ে গড়ে ওঠা একের পর এক ইকো রিসোর্ট নতুন কর্মসংস্থান, নিরাপদ আয় এবং সুন্দরবন রক্ষার বার্তা নিয়ে এসেছে। স্থানীয়দের জীবনে এই পরিবর্তন এতটাই গভীর যে, আজ অনেকেই বননির্ভর পেশা ছেড়ে পর্যটন ও সেবাখাতে যুক্ত হয়েছেন।
❑ করোনার ধাক্কা থেকে নতুন জীবনের শুরুঃ
করোনাকালে পোশাক কারখানার চাকরি হারানোর আশঙ্কায় খুলনার ঢাংমারীতে ফিরে আসেন উত্তম মিস্ত্রি। কিছুদিন বেকার থাকার পর তিনি কাজ পান জঙ্গলবাড়ি ম্যানগ্রোভ রিসোর্টে। বর্তমানে তিনি রিসোর্টটির একজন অভিজ্ঞ কর্মী।উত্তমের মতো একই গ্রামের আরেক তরুণ ইলিয়াসও বদলে ফেলেছেন নিজের জীবন। একসময় তার পরিবার সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। মাছ ধরা, কাঠ কাটা কিংবা বনজ সম্পদ সংগ্রহই ছিল পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। এখন তিনি একটি ইকো রিসোর্টের সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন।
সবচেয়ে বড় কথা, যারা একসময় বন থেকে জীবিকা নিতেন, তারাই এখন অন্যদের সুন্দরবন রক্ষার কথা বলছেন।
❑ ঢাংমারীতে কীভাবে গড়ে উঠল ইকো রিসোর্টের নতুন জনপদঃ
ঢাংমারী খালপাড়ের বানিশান্তা থেকে বুড়ির ডাবর বাজার পর্যন্ত গত পাঁচ থেকে ছয় বছরে গড়ে উঠেছে অন্তত ১৪টি ইকো রিসোর্ট। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
🔹 জঙ্গলবাড়ি ম্যানগ্রোভ ইকো রিসোর্ট
🔹 বনবিবি ফরেস্ট রিসোর্ট
🔹 বনবাস
🔹 অরণ্যছাড়া
🔹 ইরাবতী
🔹 বনমালী
🔹 দ্য ফরেস্ট রিট্রিট
🔹 গোল কানন
🔹 পিয়ালী
প্রথম দিকে ছোট আকারের ইকো কটেজ দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সেগুলোর অনেকগুলো হারিয়ে যায়। তবে সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বর্তমানে বড় পরিসরে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট গড়ে উঠেছে।
❑ প্রায় ৩০০ মানুষের কর্মসংস্থানঃ
ঢাংমারীর এসব ইকো রিসোর্টে সরাসরি প্রায় ৩০০ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। রিসোর্টে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে—
🔹 ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনে
🔹 সুপারভিশন ও পর্যটক সেবায়
🔹 রান্না ও খাবার পরিবেশনে
🔹 নৌকা চালনা ও পর্যটক পরিবহনে
🔹 নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতায়
এর বাইরে আরও অনেকে নতুনভাবে জীবিকা খুঁজে পেয়েছেন। কেউ মুদি দোকান দিয়েছেন, কেউ ইজি বাইক চালাচ্ছেন, আবার কেউ পর্যটক পরিবহনের জন্য জালিবোট চালাচ্ছেন। আগে যারা বাঘ, কুমির ও নানা ঝুঁকি নিয়ে জঙ্গলে যেতেন, তারা এখন অনেক বেশি নিরাপদ ও স্থিতিশীল আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।
❑ সুন্দরবনের ওপর চাপ কমছেঃ
ঢাংমারীর ইকো রিসোর্ট শুধু অর্থনীতির পরিবর্তন আনেনি, এটি সুন্দরবন সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্থানীয়দের মতে, আগে যারা বননির্ভর পেশায় যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন রিসোর্টে কাজ করছেন। ফলে বন থেকে কাঠ সংগ্রহ, শিকার কিংবা অতিরিক্ত সম্পদ আহরণের প্রবণতা কমছে। এর ফলে:
🔹 সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাচ্ছে
🔹 বন উজাড়ের ঝুঁকি কমছে
🔹 বন্যপ্রাণী শিকার হ্রাস পাচ্ছে
🔹 স্থানীয়দের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ছে
সুন্দরবনকে ঘিরে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যেখানে বন ধ্বংস না করেই বনকে কেন্দ্র করে আয় করা সম্ভব।
❑ পরিবেশবান্ধব নকশায় গড়ে উঠেছে রিসোর্টগুলোঃ
ঢাংমারীর বেশিরভাগ ইকো রিসোর্ট পরিবেশবান্ধব নকশায় নির্মিত। এসব রিসোর্টে রয়েছে:
🔹 সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার
🔹 বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা
🔹 নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
🔹 প্লাস্টিকমুক্ত পরিবেশ
রিসোর্টগুলোতে পানীয় পরিবেশন করা হয় কাঁচের বোতল বা টিনের ক্যান ব্যবহার করে। প্লাস্টিক বর্জনের উদ্যোগ এখানে স্পষ্ট। কটেজ নির্মাণেও পরিবেশের বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের গাছ না কেটে স্থানীয় এলাকা থেকে সংগ্রহ করা বাঁশ ও কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। কটেজের ছাদে ব্যবহার করা হয়েছে সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী গোলপাতা, যা পুরো পরিবেশকে আরও প্রাকৃতিক করে তুলেছে।
❑ পর্যটকদের কাছে কেন জনপ্রিয় হচ্ছে ঢাংমারীঃ
ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা এখন নিয়মিত ঢাংমারীতে আসছেন। সুন্দরবনের কাছাকাছি থেকে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ, নদীপথে নৌভ্রমণ, ক্যানেল ক্রুজ এবং স্থানীয় সাংস্কৃতিক আয়োজন—সব মিলিয়ে এই অভিজ্ঞতা অন্যরকম।
বিশেষ করে নবদম্পতি, পরিবার ও বন্ধুদের দল ঢাংমারীর রিসোর্টগুলোকে ভ্রমণের জন্য বেছে নিচ্ছেন। আড়াই ঘণ্টার নৌভ্রমণ দিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা অনেকের কাছে হয়ে উঠছে স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। ঢাংমারীতে পর্যটকদের জন্য রয়েছে:
🔹 সুন্দরবনের কাছাকাছি থাকার সুযোগ
🔹 নদীপথে ভ্রমণ
🔹 ক্যানেল ক্রুজ
🔹 স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারের অভিজ্ঞতা
🔹 পরিবেশবান্ধব আবাসন
❑ উন্নয়নের পথে এখনও যেসব চ্যালেঞ্জঃ
সম্ভাবনা থাকলেও ঢাংমারীর ইকো রিসোর্ট খাত এখনও কিছু সমস্যার মুখোমুখি। রিসোর্ট মালিকদের মতে, নীতিগত সমন্বয়ের অভাবে এই খাত পুরোপুরি বিকশিত হচ্ছে না। প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
🔹 পর্যটন, বন ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব
🔹 অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
🔹 নদীপথে যাতায়াতের জটিলতা
🔹 প্রশিক্ষিত জনবল সংকট
🔹 দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব
এই খাতকে আরও এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
❑ সবুজ অর্থনীতির এক অনন্য উদাহরণঃ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই বন ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। ঢাংমারীর ইকো রিসোর্টগুলো সেই সম্ভাবনার বাস্তব উদাহরণ। এখানে মানুষ বন ধ্বংস করে নয়, বরং বনকে রক্ষা করেই আয় করছেন। ফলে একই সঙ্গে বাড়ছে কর্মসংস্থান, কমছে দারিদ্র্য এবং সংরক্ষিত থাকছে সুন্দরবনের মতো অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ।
ঢাংমারীর ইকো রিসোর্ট শুধু পর্যটনের নতুন গন্তব্য নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের সফল মডেল। উত্তম, ইলিয়াসদের মতো শত শত মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে এই উদ্যোগ। একই সঙ্গে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বন রক্ষার নতুন পথ দেখাচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি সহায়তা এবং টেকসই উদ্যোগ থাকলে ঢাংমারী ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
5,000 tk
2 Days - 3 Nights