সুন্দরবনের প্রাণীজগত
সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, যেখানে প্রকৃতি নিজেই তৈরি করেছে এক অনন্য প্রাণীকুল। এই বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও সবুজ অরণ্য হাজারো প্রাণীর আশ্রয়স্থল। এখানে রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, কুমিরসহ নানা ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ ও জলজ প্রাণী।
রয়েল বেঙ্গল টাইগার: সুন্দরবনের গর্ব

সুন্দরবনের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাণী হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এই শক্তিশালী শিকারি অনন্য অভিযোজন ক্ষমতার জন্য পরিচিত এবং পানিতে সাঁতার কাটতে দক্ষ। এরা সাধারণত একাকী চলাফেরা করে এবং মূলত হরিণ, বন্য শুকর এবং অন্যান্য ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকার করে। সুন্দরবনের জটিল জলাভূমির পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এদের বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে। পানির মধ্যে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে শিকার ধরার ক্ষমতা এবং ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে নিঃশব্দে চলার দক্ষতা এদের প্রকৃতির অন্যতম শক্তিশালী শিকারিতে পরিণত করেছে।
চিতল হরিণঃ সৌন্দর্যের প্রতীক

সুন্দরবনে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় চিতল হরিণ, যা তাদের সাদা ফোঁটা দেওয়া বাদামি গায়ের রঙের জন্য সহজেই চেনা যায়। এরা দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে এবং প্রধানত ঘাস, গাছের পাতা ও ছাল খেয়ে বেঁচে থাকে। বাঘের অন্যতম প্রধান শিকার চিতল হরিণ। এদের উপস্থিতি সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলা ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে।
লবণাক্ত পানির কুমিরঃ শক্তিশালী শিকারি

নদী ও খাঁড়িগুলোতে দেখা যায় লবণাক্ত পানির কুমির, যারা শিকারের জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারে। এরা প্রধানত মাছ, কচ্ছপ ও ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকার করে এবং পানির নিচে দীর্ঘক্ষণ নিঃশব্দে থাকতে পারে। এই কুমিরদের সংখ্যা দিনে দিনে কমছে, তাই সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বন্য শুকর ও বনবিড়ালঃ গোপন বাসিন্দা


বন্য শুকর সুন্দরবনের অন্যতম সাধারণ প্রাণী। এরা সাধারণত মাটির নিচের কন্দমূল ও ছোট প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। বনবিড়াল সাধারণত নিশাচর এবং বেশ লাজুক স্বভাবের। এরা ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি ও সরীসৃপ খেয়ে জীবনধারণ করে।
পাখিদের স্বর্গরাজ্যঃ

সুন্দরবনে প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। এদের মধ্যে মাছরাঙা, শকুন, চিল, সারস, বিভিন্ন ধরনের হাঁস উল্লেখযোগ্য। সুন্দরবনের খাঁড়ি, নদী ও গাছপালার মধ্যে এই পাখিদের বসবাস ও প্রজনন হয়।
অতিথি পাখিদের আগমনঃ


শীতকালে বহু পরিযায়ী পাখি আসে, যা এই বনের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করে। এদের মধ্যে রয়েছে সাইবেরিয়ান হাঁস, ধলাগলা বক, রঙিন হাঁস এবং বিভিন্ন ধরনের জলচর পাখি।
বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণঃ
সুন্দরবনের অনেক প্রাণী বিপন্ন হয়ে পড়েছে। বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ শিকার ও মানব হস্তক্ষেপের কারণে অনেক প্রজাতির সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। বন সংরক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি এই অনন্য পরিবেশ রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ও পরিবেশ সংস্থা বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করছে যাতে সুন্দরবনের প্রাণীদের টিকে থাকার সুযোগ দেওয়া যায়।
সুন্দরবনের প্রাণীকুল প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি। আমাদের সবার দায়িত্ব এই বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা, যাতে ভবিষ্যত প্রজন্মও এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে। সংরক্ষণ প্রচেষ্টা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমরা সুন্দরবনের প্রাণীকুলকে রক্ষা করতে পারি এবং প্রকৃতির এই আশ্চর্য ভূমিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি।
5,000 tk
2 Days - 3 Nights